মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন হিমাগারে গত তিন দিনে আবারও কমে গেছে আলুর দাম। সম্প্রতি ৫০ কেজির এক বস্তা আলু যেখানে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, এখন একই বস্তা মিলছে মাত্র ৫৫০ থেকে ৫৮০ টাকায়। দাম বাড়ার খবর শুনে কৃষকেরা দলিলসহ হিমাগারে ছুটে এলেও বর্তমান দর দেখে তারা হতাশ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। মুন্সীগঞ্জ সদর ও টংগিবাড়ী উপজেলার কয়েকটি হিমাগার ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে।
মাকহাটি হিমাগারের সামনে দেখা যায়, আলুর দলিল হাতে নিয়ে কৃষকদের ভিড়। অনেকেই আগের বেশি দামের কথা মাথায় রেখে আলু বিক্রি করতে এলেও নতুন দর শুনে নিরাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কয়েক দিন আগেও বস্তাপ্রতি ৭০০ টাকা পাওয়ার আশায় ক্ষতি কিছুটা পূরণ করার ভাবনা থাকলেও বর্তমান বাজারদর তাদের সেই আশা ভেঙে দিচ্ছে। টংগিবাড়ীর নুর সানোয়ারা ও শরীফ কোল্ড স্টোরেজেও একই পরিস্থিতি দেখা গেছে।
হিমাগারগুলোতে এখন বীজ আলু নিতে এবং আলু বিক্রি করতে কৃষকের আনাগোনা বাড়লেও শেষ সময়ে হিমাগার কর্তৃপক্ষ ব্যাপক চাপে পড়েছে। মোল্লাকান্দি গ্রামের কৃষক সেকান্দর বেগ জানান, কয়েক দিন আগে দাম একটু বাড়লেও এখন আবার কমে গেছে, তাই আলু বেচার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, সার–বীজ–শ্রমিকের খরচ নিয়ে আগের বছরই তারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন, ফলে এই মৌসুমে তিনি আবাদও কমিয়েছেন।
কৃষক বেলাল হোসেন জানান, সরকারি লোকাল বীজ ৩৫ টাকা কেজি হলেও অন্যান্য জাতের বীজ ৫০–৬০ টাকা। বিদেশি আমদানি করা বীজের ৫০ কেজির বস্তা ১৫–২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অথচ নিজেদের উৎপাদিত বীজ আলু ঠিকমতো বিক্রি করতে পারছেন না তারা। গত বছরও লোকসানের মুখ দেখেছেন। কৃষক আব্দুর রহমান জানান, সরকার ২২ টাকা কেজি দরে কিনবে বললেও বাস্তবে তারা ১০ টাকা কেজিও পাচ্ছেন না।
ব্যবসায়ী আশরাফ মিয়া জানান, ১৬ লাখ টাকার আলু হিমাগারে রেখেছিলেন, এখন ৪ লাখ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। দাম বাড়লেই সরকারের তদারকি আসে, কিন্তু দাম কমে গেলে কেউ খোঁজ নেয় না বলে তিনি অভিযোগ করেন। ব্যবসায়ী হাজী সৈয়দ দেওয়ান জানান, একসময় নেপালে আলু রপ্তানি হওয়ায় দাম হঠাৎ বেড়েছিল, কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানে তা আবার কমে গেছে। আলাল মিয়া জানান, সারা বছর ৩৫০–৪০০ টাকা বস্তায় আলু বিক্রি হলেও কয়েক দিন আগে দাম বাড়লেও এখন আবার তা নেমে গেছে।
বর্তমানে হিমাগারে থাকা ৫০ কেজির বস্তা ৫৫০–৫৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হিমাগার ভাড়া ৩০০ টাকা বাদ দিলে কৃষকের হাতে থাকছে মাত্র ২২০–২৫০ টাকা, যা আলুর খালি বস্তার দাম ও পরিবহন খরচ তুলতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচের হিসাব মেলানো তো দূরের কথা, কৃষকেরা লোকসান নিয়েই বাড়ি ফিরছেন। তাদের হিসাবে প্রতি বস্তায় এখন ৭০০–৭৫০ টাকার ক্ষতি গুনতে হচ্ছে।
হিমাগার কর্তৃপক্ষ জানায়, সারা বছর আলুর দাম ৩৫০–৫০০ টাকার মধ্যে থাকায় কৃষকেরা আলু বিক্রি করতে আসেননি। তবে গত সপ্তাহে হঠাৎ দাম বাড়ায় কিছুটা নড়াচড়া দেখা গেলেও আবার তা কমে গেছে। আগের বছরের তুলনায় এবার দ্বিগুণেরও বেশি আলু হিমাগারে মজুত রয়েছে।
টংগিবাড়ীর সানোয়ারা ও নুর কোল্ড স্টোরেজের সুপারভাইজার জানান, দুটি হিমাগারে এখনো ১ লাখ ৮০ হাজার বস্তা আলু মজুত আছে, যেখানে গত বছর এ সময় মজুত ছিল মাত্র ৮০–৯০ হাজার বস্তা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, এ বছর জেলায় সচল ৬১টি হিমাগারে ১ লাখ ৯০ হাজার টন আলু রয়েছে। এগুলো বাজারে ছাড়ার পর কিছুটা স্বাভাবিকতা ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বছর আলুচাষের লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা কমানো হয়েছে এবং কৃষকদের বিকল্প ফসল উৎপাদনে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আমদানি বীজের সিন্ডিকেট বিষয়ে তদারকি চলছে বলে জানান বিভাগীয় উপ-পরিচালক ড. মো. হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, বিএডিসির পর্যাপ্ত বীজ রয়েছে এবং সেগুলো ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে।