মুন্সীগঞ্জ জুড়ে এখন ছড়িয়ে পড়েছে ড্রাগ রেজিস্ট্রেশন (ডিআর) নম্বরবিহীন ও বিক্রয়–নিষিদ্ধ ওষুধ। নাম–বেনামে বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিদের পাশাপাশি অসাধু চিকিৎসক ও ফার্মেসি দোকানিরা এসব ওষুধ রোগীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। অনেকেই আবার ইনভয়েসবিহীন ভেজাল ও স্বল্পমানের ওষুধ বিক্রির মাধ্যমে মুনাফা অর্জনে জড়িত। এসব ওষুধ সেবনে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, সাধারণ মানুষ কম শিক্ষিত হওয়ায় প্রথমেই তারা স্থানীয় ফার্মেসিতে যান। সেখানে অজস্র নিম্নমানের ও নিষিদ্ধ ওষুধ ধরিয়ে দেওয়ায় রোগ সারে না। পরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে গিয়ে রোগীরা ওষুধের খালি পাতা দেখিয়ে অভিযোগ করেন যে অনেক টাকা খরচ করেও সুস্থ হতে পারেননি।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, প্রতিটি ওষুধ কোম্পানি যদি ফার্মেসিকে ইনভয়েস সরবরাহ করে, তাহলে সহজেই বোঝা যাবে কোম্পানিটি ঔষধ প্রশাসনের তালিকাভুক্ত কিনা। এছাড়া নিবন্ধিত সব ওষুধের তালিকা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটেও দেওয়া আছে।
মুন্সীগঞ্জ শহর ও প্রত্যন্ত এলাকার ফার্মেসিগুলো ঘুরে দেখা যায়—প্রেসক্রিপশন ছাড়াই সরাসরি এসব ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। অনেক চিকিৎসকও ক্লিনিকে বসে রোগীদেরকে এই ডিআর নম্বরবিহীন ওষুধ প্রেসক্রাইব করছেন। রোগীর মুখে উপসর্গ শুনেই দোকানিরা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দিচ্ছেন।
ফার্মেসিগুলোতে ইনভয়েসবিহীন ওষুধের পাশাপাশি অনুমোদনবিহীন ফুড সাপ্লিমেন্ট, বিদেশি স্কিন–কেয়ার পণ্য, যৌন উত্তেজক ও নানা অজানা কোম্পানির ক্যাপসুল–ট্যাবলেট খোলামেলাভাবে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সুতিং জেল, রেভিকাল, বনবিয়ান, ওমেগা–৩, বায়োমেগা ক্যাপসুল, নোভাপ্লেক্স, রেটিনেক্স, জিসিএম প্লাসসহ আরও অনেক পণ্য।
অনেক ফার্মেসি মালিক স্বীকার করেন, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে এসব বিদেশি ও ডিআরবিহীন ওষুধের নাম থাকায় তারা বাধ্য হয়ে বিক্রি করেন। এছাড়া বেশি লাভের আশায় ইনভয়েসবিহীন পণ্য কিনে বিক্রি করছেন। মুন্সীগঞ্জ সদরে পাঁচ–ছয়জন বিক্রয় প্রতিনিধি এই অবৈধ সরবরাহে জড়িত। এদের মধ্যে মিজান, রাফি, ইলিয়াস বিদেশি নিষিদ্ধ ওষুধ সরবরাহ করেন; আর বসির, আলমগীর ও নাজির চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ইনভয়েসবিহীন ওষুধ এনে ফার্মেসিগুলোতে পৌঁছে দেন।
ফার্মেসি মালিক সেজে যোগাযোগ করলে এসব প্রতিনিধিরা স্বীকার করেন যে ফোনে অর্ডার পেলেই তারা নির্দিষ্ট দোকানে ওষুধ পৌঁছে দেবেন। তাদের কেউ কেউ বলেন, বিদেশি এসব পণ্যের আমদানির বৈধতা নেই, তাই সরকারিভাবেও তারা দায় নেন না।
মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. সাইদ হোসেন জানান, অনেক রোগী নিম্নমানের ওষুধ সেবনের কারণে সুস্থ হতে না পেরে অভিযোগ নিয়ে আসেন। তাদের দেখানো ওষুধ থেকেই অনিয়ম ধরা পড়ে।
এদিকে জেলা ঔষধ প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়ক গোলাম মোস্তফা জানান, জেলায় প্রায় ১,৬০০ লাইসেন্সধারী ফার্মেসি রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ২৪টি ফার্মেসিকে দুই লাখ টাকা জরিমানা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অবাধ বিক্রি ও ফিজিশিয়ানস স্যাম্পল বিক্রির অভিযোগে আটটি মামলা হয়েছে। এছাড়া ভেজাল ও নকল ওষুধ শনাক্তে ১০০টি নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
এই পরিস্থিতি ফার্মাসিউটিক্যাল নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করেছে, যা জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধ প্রয়োজন।