মুন্সীগঞ্জে আলুর বাম্পার ফলন হলেও আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকরা। প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে যেখানে ১৬ থেকে ১৮ টাকা খরচ হচ্ছে, সেখানে পাইকারি বাজারে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১২ টাকায়। খুচরা বাজারে দাম ১৮ থেকে ২০ টাকা হলেও কৃষকরা সরাসরি খুচরা বিক্রি করতে না পারায় উৎপাদন খরচের অর্ধেকও উঠছে না। ফলে লোকসান গুনতে হচ্ছে ১৪ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত।
হিমাগারে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনেক কৃষক ঘরে আলু মজুত করেছেন, যা দ্রুত পচে যাচ্ছে। জেলার ছয় উপজেলার কৃষকরা বলছেন, এ অবস্থায় আলু বিক্রি করে কোনো লাভ মিলছে না। তাই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ভাবছে, আলুকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এবং সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসার। কৃষকদের মতে, সরকার সরাসরি তাদের কাছ থেকে আলু কিনে খাদ্য কর্মসূচিতে ব্যবহার করলে ক্ষতি কিছুটা কমবে। পাশাপাশি বিদেশে আলুর বাজার তৈরি ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করাও জরুরি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মুন্সীগঞ্জে ৩৪ হাজার ৭৫৮ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে, উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ ৮২ হাজার টন। গত বছরের তুলনায় এটি ৫২ হাজার টন বেশি। জেলায় ৭৪টি হিমাগার থাকলেও সচল আছে ৫৮টি, যেগুলোর ধারণক্ষমতা ৫ লাখ টন। ফলে অবশিষ্ট প্রায় ৫ লাখ ৮২ হাজার টন আলু হিমাগারে রাখা যায়নি, কৃষকদের বাধ্য হয়ে ঘরে সংরক্ষণ করতে হচ্ছে।
এ বছর উৎপাদন, পরিবহন, শ্রম খরচ ও হিমাগার ভাড়া মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুর খরচ দাঁড়িয়েছে ২৬ থেকে ২৮ টাকা। গত বছরের তুলনায় হিমাগারের ভাড়াও বেড়েছে; ৫০ কেজির বস্তাপ্রতি ভাড়া ২১০–২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৩০০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের লোকসান আরও বেড়েছে। হিসাব অনুযায়ী, এখন প্রতি বস্তায় ক্ষতি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা। বাজার পরিস্থিতি না বদলালে ক্ষতির পরিমাণ পৌনে ৮০০ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিক্রমপুর মাল্টিপারপাস কোল্ডস্টোরের ব্যবসায়ী হারুন জানান, মৌসুমে ৪ হাজার বস্তা আলু কিনে হিমাগারে রেখেছিলেন। খরচসহ কেজি পড়েছে ২৭ টাকা। কিন্তু বর্তমানে পাইকাররা ১২ টাকার বেশি দিচ্ছেন না। এতে লাখ লাখ টাকা লোকসান হবে। একই কোল্ডস্টোরের ব্যবস্থাপক আবদুর রশীদ বলেন, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অবস্থা শোচনীয়, সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া এ অবস্থা কাটবে না।
সিরাজদীখান উপজেলার কৃষক মোহাম্মদ ইয়াছিন শেখ জানান, ৬ কানি জমিতে ২০ লাখ টাকা খরচ করে দেড় হাজার বস্তা আলু পেয়েছেন। এর মধ্যে এক হাজার বস্তা বিক্রি করে মাত্র ৫ লাখ টাকা আদায় করেছেন, বাকি আলু হিমাগারে রাখা আছে। তিনি আশঙ্কা করছেন, এভাবে বিক্রি করলে ১৩–১৪ লাখ টাকার মতো ক্ষতি হবে। একই উপজেলার নুর হোসেন ৩ হাজার ৪০০ বস্তা আলু হিমাগারে রেখেছেন। প্রতি কেজি উৎপাদনে খরচ হয়েছে ২৮ টাকা, কিন্তু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১২ টাকায়। এতে প্রায় ৩২ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ–পরিচালক বিপ্লব কুমার মোহন্ত জানান, এ বছর দেশে গতবারের তুলনায় ২৪ লাখ টন বেশি আলু উৎপাদন হয়েছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম কমে গেছে। কৃষকদের ক্ষতি কাটাতে আলুকে টিসিবি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে চাহিদা অনুযায়ী আলু চাষ ও উৎপাদন খরচ কমানোই সমাধান হতে পারে।