ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জাতীয় সংসদকে তিনি এমন একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে চান যেখানে যুক্তি, তর্ক ও জাতীয় সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে।
বৃহস্পতিবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের সূচনায় দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের নির্মমতার শিকার অসংখ্য মানুষের কান্না ও হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জনগণের ভোটে আবারও একটি জবাবদিহিমূলক ও সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে।
তিনি মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানিয়ে বলেন, তাঁর অশেষ রহমতেই একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নতুন পথচলা শুরু করা সম্ভব হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম পর্যন্ত গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, সংসদের এই সূচনালগ্নে তিনি তাঁদের গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, এসব আন্দোলনে যেসব মা তাঁদের সন্তান হারিয়েছেন, যেসব পরিবার স্বজন হারিয়েছে এবং যেসব আহত মানুষ স্বাভাবিক জীবন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন—তাঁদের অবদান জাতি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।
নির্যাতন, নিপীড়ন, রাজনৈতিক হয়রানি ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে যারা সর্বস্ব হারিয়েছেন, সেই সঙ্গে ছাত্র-জনতা, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবীসহ সমাজের নানা পেশার মানুষ—যারা গুম, খুন, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন কিংবা ‘আয়নাঘর’-এর মতো অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে আসেননি—তাঁদের সাহসী ভূমিকাতেই দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই সূচনায় স্বাধীনতাপ্রিয় গণতান্ত্রিক ছাত্র-জনতাকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী।
ভাষণে তিনি বলেন, দেশনেত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেই গণতন্ত্রকে প্রহসনে পরিণত করে সংসদকে অকার্যকর করে তোলা হয় এবং দেশে তাবেদারি শাসন কায়েম করা হয়।
তিনি আরও বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য খালেদা জিয়া জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সংগ্রাম করেছেন এবং কখনো স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আপস করেননি। তবে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি তিনি দেখে যেতে পারেননি। তাই সংসদে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট Ziaur Rahman বলেছিলেন, “জনগণই যদি রাজনৈতিক দল হয়, তাহলে আমি সেই দলেই আছি।” অর্থাৎ ব্যক্তি বা দলের স্বার্থ নয়, জনগণের স্বার্থই সর্বাগ্রে—এটাই বিএনপির রাজনীতি।
তিনি বলেন, প্রথমবারের মতো বিএনপি থেকে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য ও সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি পুরো দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
তিনি বলেন, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন দেশের ও জনগণের স্বার্থ রক্ষার রাজনীতি। বিএনপি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করে তোলাই তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ, নিরাপদ, গণতান্ত্রিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি গণতান্ত্রিক শক্তি ও জাতীয় সংসদের সব দলের সদস্যদের সহযোগিতা কামনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু ফ্যাসিবাদমুক্ত, স্বাধীন, সার্বভৌম ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রশ্নে কোনো দ্বিমত থাকার সুযোগ নেই।
তিনি অভিযোগ করেন, বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট সরকার জাতীয় সংসদকে জাতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত না করে কার্যত অকার্যকর করে ফেলেছিল। নতুন সংসদের যাত্রা শুরুর সময় সাবেক স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও জনরোষের কারণে তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি; কেউ কারাগারে, কেউ নিখোঁজ কিংবা কেউ পলাতক রয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দীর্ঘ দেড় দশকের শাসন-শোষণের পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে সংসদের কার্যক্রম শুরু হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
এ সময় সংবিধান ও কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্বের জন্য প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও পাঁচবারের সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন-এর নাম প্রস্তাব করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদীয় ইতিহাসে এ ধরনের পরিস্থিতি নজিরবিহীন নয়। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানসংসদের সদস্য মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের-এর নাম প্রস্তাব করেছিলেন এবং তাঁর সভাপতিত্বেই বাংলাদেশের প্রথম সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছিল।






